পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আগামী ২ জুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এবার পণ্য আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস করে বাজেট প্রস্তাবনা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে এতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নানা পরামর্শের প্রভাব দেখছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে এবারের বাজেটও পূর্ববর্তী ধারা বজায় রেখে প্রস্তুত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে একদিকে দেশীয় উৎপাদন শিল্প চাপে পড়বে, অন্যদিকে বিভিন্ন পণ্যের আমদানি উৎসাহিত হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
আসন্ন বাজেটে আমদানি শুল্ক (কাস্টমস ডিউটি বা সিডি), সম্পূরক শুল্ক (সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি বা এসডি) ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (রেগুলেটরি ডিউটি বা আরডি) স্তর পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশীয় উৎপাদন শিল্পে, একই সঙ্গে আমদানিতে উৎসাহ বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। নতুন বাজেটে যেসব পণ্যের দাম বাড়বে, এর মধ্যে রয়েছে এলইডি বাতি, খেলনা, নির্মাণসামগ্রী, রড, সিমেন্ট, স্ক্রু, বোল্ট। আবার কিছু পণ্যের শুল্ক কমানোর প্রস্তাবও রয়েছে যেমন চিনি, জ্বালানি তেল, ইনসুলিন, পশুখাদ্য, বিদেশী জুস, ক্রিকেট ব্যাট ইত্যাদি। তবে বাস্তবে এগুলোর দাম কমবে কিনা, তা অনিশ্চিত।
বর্তমানে শূন্য থেকে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ছয় স্তরের আমদানি শুল্ক কাঠামো বিদ্যমান রয়েছে। আসন্ন বাজেটে এটিকে সাত স্তরে শূন্য থেকে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন স্তর হিসেবে ৩ শতাংশ হারের শুল্ক যুক্ত করা হচ্ছে। তবে প্রধান প্রধান খাদ্যদ্রব্য, সার, বীজ, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও তুলাসহ শিল্পের কাঁচামালের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্কহার অপরিবর্তিত থাকছে। এছাড়া ১৩৫টি পণ্যের কাস্টমস ডিউটি হ্রাস বা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত ১২ স্তরবিশিষ্ট সম্পূরক শুল্ক কাঠামো বিদ্যমান রয়েছে। আসন্ন বাজেটে এটি ১৩ স্তরবিশিষ্ট করা হচ্ছে। নতুন স্তর হিসেবে ৪০ শতাংশ হারের শুল্ক যুক্ত করা হচ্ছে। এ রকম ১৭২টি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশীয় উৎপাদকদের ওপর বাড়তি ভ্যাট-ট্যাক্স আরোপ করা হচ্ছে, এটা করলে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে মিল রাখার কথা বলা হচ্ছে। এখন শিল্পই যদি টিকে না থাকে, সেখানে কারখানা রাখা না রাখার কিছু নেই। সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে যাবে। আর ভ্যাট, ট্যাক্স যা-ই ধরেন, দিন শেষে সব ভোক্তার ঘাড়ে গিয়েই পড়বে। এখন সাধারণ মানুষের তো আয় বাড়েনি। দেশে এর মধ্যেই বেকারের সংখ্যা বেড়েছে।
বাজেটে আগের ধারাই চলছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘বাজেট আসলেই ভ্যাট, ট্যাক্স বাড়িয়ে দেয়া হতো, এবারো তাই হচ্ছে। এসব না করে সরকারের উচিত টাকা পাচার, কর ফাঁকি, ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিং বন্ধ করা। চোরাচালানের মাধ্যমে বহু পণ্য দেশের বাজারে ঢুকছে, সেসব বন্ধ করা উচিত। অনেকেই কর দেনই না। তাদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া উচিত। অনেকে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা যেমন এনবিআরকে ব্যবহার করে কর ফাঁকি দেন। সেসব বন্ধ করা উচিত। তাহলে সরকার নিজের আয় বাড়াতে পারে।’ কর প্রদানকারী ও সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ দেয়ার এ নীতি ভালো ফল বয়ে আনবে না বলেও মনে করেন ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট।
আসন্ন বাজেটে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ আমদানি শুল্ক হারযুক্ত (২৫ শতাংশ) প্রায় সব পণ্যের ওপর আরোপিত ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি অব্যাহত থাকছে। তবে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিশেষ রেয়াতি সুবিধা দেয়া হয়েছে, এমন কিছু পণ্যকে আগের মতো রেগুলেটরি ডিউটির আওতার বাইরে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, ১ শতাংশ শুল্ক সুবিধায় বাণিজ্যিকভাবে বিশেষত ব্যাটারিচালিত রিকশায় ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ৭৫০-১২০০ ওয়াটের ক্ষমতাসম্পন্ন মোটর দেদারসে আমদানি হচ্ছে। তবে এবার ১২০০ ওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ডিসি মোটর আমদানিতে ১৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি বসছে। এছাড়া নিউজপ্রিন্ট কাগজ আমদানিতে বিদ্যমান কাস্টমস ডিউটি ৫ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিতে ইনসুলিন উৎপাদনে ভায়াল বা কার্টিজ ফিলিংয়ের সময় সংযোগ স্থাপনকারী স্টেরিল কানেক্টর আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এছাড়া ইনসুলিনের প্যাকিং ম্যাটেরিয়ালস ডিএমএফ গ্রেড সিওসি বা সিওপি ভায়াল আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
দেশের মুদ্রণ, প্রকাশনা ও ওষুধ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত ডুপ্লেক্স বোর্ড, আর্ট পেপার, আর্ট কার্ড ও ক্রাফট লাইনার পেপার আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণে প্রস্তাব করা হয়েছে। পোকামাকড়, কীটনাশক ও দাগমুক্ত ফল উৎপাদনে ব্যবহৃত ফ্রুট ব্যাগ আমদানিতে বিদ্যমান কাস্টমস ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে ভ্যাকসিন উৎপাদনে ব্যবহৃত টানজেনটিয়াল ফ্লো ফিল্টারেশন (টিএফএফ) সিস্টেম আমদানিতে ১ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
জনপ্রিয় সি-ফুড জাপানিজ স্ক্যালোপ রফতানির উদ্দেশ্যে প্রক্রিয়াজাত করার জন্য কাঁচামাল হিসেবে খোলসযুক্ত অবস্থায় আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাটার আমদানিতে ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তামাকপণ্য সিগারেট, জর্দা, গুল ইত্যাদি আমদানিতে শূন্যের পরিবর্তে ২৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটির প্রস্তাব করা হয়েছে। ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য নিউট্রালাইজড সয়াবিন তেল আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ সিডির পরিবর্তে শূন্য হার নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
নন অ্যালকোহলিক ড্রিংকস জাতীয় পণ্য আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক ১৫০ থেকে কমিয়ে ১০০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সয়াবিন মিল আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি শূন্য থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। দেশীয় কাগজ শিল্পের সুরক্ষায় সেলফ কপি পেপার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য কেওলিন ক্লে আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। মার্বেল ও গ্রানাইট বোল্ডার আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক ২০ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশ এবং ভ্যাট রেজিস্টার্ড মার্বেল ও গ্রানাইট টাইলস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য আগের হার ২০ শতাংশ বহাল রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
সিমেন্ট উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানিতে স্পেসিফিক শুল্কের পরিবর্তে অ্যাড ভেলরেম কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্লিংকার আমদানিতে ১৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি আরোপের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। কালি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অধিকাংশের আমদানিতে শুল্কহার ২৫ শতাংশ, কালি আমদানিতে ১৫ শতাংশ এবং কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব সুপারিশ করা হয়েছে।
আয়োডিনযুক্ত লবণের মূল্য সহনীয় রাখতে পটাশিয়াম আয়োডেট আমদানিতে বিদ্যমান কাস্টমস ডিউটি ৫ শতাংশ প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। শিরিষ কাগজ উৎপাদনের কাঁচামাল ফেনোলিক রেজিনের কাস্টমস ডিউটি ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ এবং স্যান্ড পেপার কোটিং ম্যাটেরিয়ালের কাস্টমস ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল মোল্ড পাউডারে কাস্টমস ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ ও ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
হোস পাইপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য কানেক্টর আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। দেশীয় উৎপাদনকারীদের সুরক্ষা দিতে স্ক্রু, নাট ও বল্টু আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ২৫, রেগুলেটরি ডিউটি ৩, সম্পূরক শুল্ক ২০, মূসক ১৫, আগাম কর ৫ ও অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। উড়োজাহাজের ইঞ্জিন আমদানিতে বিদ্যমান কাস্টমস শুল্ক শূন্য থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
এসএমই শিল্প, আইটি ফার্ম ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আমদানি করা অপারেটিং সিস্টেম, ডাটাবেজ, ডেভেলপমেন্ট টুলস ও সিকিউরিটি সফটওয়্যারের কাস্টমস ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হচ্ছে। ১৬ থেকে ৪০ সিটের বাস আমদানিতে বিদ্যমান কাস্টমস ডিউটি ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হচ্ছে।
হেলিকপ্টার আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি শূন্য থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ, মূসক ১৫ শতাংশ, আগাম কর ৫ শতাংশ ও অগ্রিম কর ৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এলইডি ল্যাম্পের পার্টস আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ১০ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হচ্ছে। পরিশোধিত চিনি আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি প্রতি টনে ৫০০ টাকা কমিয়ে ৪ হাজার টাকা করা হচ্ছে। ১০-১৫ আসনের মাইক্রোবাস আমদানিতে বিদ্যমান সম্পূরক শুল্ক ২০ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হচ্ছে। তবে রাইস ব্র্যান অয়েল রফতানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ বহাল থাকবে।
এছাড়া আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকতে পারে। এর মধ্যে ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিতে আমদানি-রফতানির শর্ত শিথিলের পাশাপাশি ন্যূনতম জরিমানার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। আমদানি ঘোষণাপত্রে ছোটখাটো ভুলের জন্য জরিমানা হ্রাস ও আমদানি নীতি আদেশ (আইপিও) লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ন্যূনতম জরিমানার বিধান শিথিল করা হতে পারে।